banglarmukul
২ নভেম্বর ২০২৬, ৬:৫৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রায়পুরে অভিযানের পরও থামছে না অভৈধ বালু উত্তোলন ।। রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে সমন্বয়ের অভিযোগ

প্রদীপ কুমার রায় :

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মেঘনা নদীর শাখা খাল ও তীরবর্তী এলাকায় অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না। প্রশাসনের একাধিক অভিযান, ড্রেজার ও পাইপ ধ্বংস এবং একজনকে কারাদণ্ড দেওয়ার পরও নতুন করে ড্রেজার বসিয়ে চলছে বালু উত্তোলন। উপজেলার ৮ নম্বর দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত আটটি পয়েন্টে বিরতিহীনভাবে এ কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এতে নদীতীরবর্তী বসতভিটা, ফসলি জমি, সরকারি খাসজমি ও গ্রামীণ সড়ক ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, এ অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াত-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি অংশ জড়িত। রাজনৈতিক অঙ্গনে দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও বালুর ব্যবসার স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ভিন্ন হলেও বালু উত্তোলন ও বিক্রির ক্ষেত্রে অনেকেই একসঙ্গে কাজ করছেন। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না।

সরেজমিনে স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চরকাছিয়া পানির ঘাট, ধানু হালদারের খেয়াঘাট, কানিবগার চর, ভাঙারটেকসহ বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। পানির ঘাট থেকে দক্ষিণে বোরহান সরকারের বাড়ির পশ্চিম পাশ হয়ে মিয়ারহাট ও ধানু হালদারের খেয়াঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় আটটি পয়েন্টে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে চরকাছিয়া গ্রামের রাহুল ঘাট এলাকায় পাশাপাশি একাধিক ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। কোথাও ছয়টি, কোথাও সাত থেকে আটটি ড্রেজার এবং উত্তর ও দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে সব মিলিয়ে ১৩ থেকে ১৮টি ড্রেজার সক্রিয় থাকার তথ্য দিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দিন-রাত ড্রেজার চালিয়ে খাল ও নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলে পাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, নদীর তীরের স্থিতিশীলতা এবং আশপাশের জমির মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও ফসলি জমির পাশ থেকে মাটি সরে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন কৃষকেরা।

অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে এর আগে গত ৯ আগস্ট চরকাছিয়া এলাকায় তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান কাউছারের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। ওই অভিযানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে একজনকে আটক করে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এ সময় একটি ড্রেজার এবং প্রায় চার হাজার ফুট পাইপ জব্দ করে বিনষ্ট করা হয়। এরপর ১৮ আগস্ট হাজিমারা এলাকায় আরেকটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় অবৈধ ড্রেজার ও বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত পাইপ বিনষ্ট করা হয়। তবে বালু উত্তোলনকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের পর কিছুদিন বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও পরে আবার বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার বসানো হয়েছে। পানির ঘাট থেকে রাহুল ঘাটসহ আশপাশের এলাকায় নতুন করে ড্রেজার চালু হওয়ায় একের পর এক অভিযানেও কেন স্থায়ীভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না, তা জানতে চান এলাকাবাসী। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন ব্যক্তির নাম আলোচনায় এসেছে। তাঁদের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মী এবং স্থানীয় জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বালু উত্তোলন ও সরবরাহের স্বার্থে রাজনৈতিক বিভেদ গুরুত্ব পাচ্ছে না।

নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে তাঁদের বসতভিটা ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। শুধু জমি নয়, স্থানীয় সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো কোনো স্থানে বালু উত্তোলনের পাইপ ও বাঁধের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। এই জমিই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। বালু তুলতে তুলতে জমি ভেঙে যাচ্ছে। ঘরবাড়ি হারানোর ভয় নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কথা বলতেও ভয় লাগে। প্রশাসন যদি আমাদের রক্ষা না করে, তাহলে কোথায় যাব?’ স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ফসলি জমি হারালে তাঁদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। অনেক পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে ড্রেজার ও পাইপ বিনষ্ট করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত অর্থের উৎস, বালু পরিবহনের ব্যবস্থা, সরবরাহের স্থান এবং নেপথ্যের ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মেঘনাপাড়ের মানুষের প্রশ্ন—একাধিক অভিযানের পরও যদি একই এলাকায় আবার ড্রেজার বসে, তাহলে এসব অভিযান কি কেবল সাময়িক প্রতিরোধেই সীমাবদ্ধ থাকবে? তাঁদের দাবি, অবিলম্বে আটটি অভিযোগকৃত পয়েন্টে সরেজমিন তদন্ত, অবৈধ ড্রেজার অপসারণ, বালু উত্তোলনকারীদের শনাক্ত এবং নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা বসতভিটা ও কৃষিজমি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রায়পুরে অভিযানের পরও থামছে না অভৈধ বালু উত্তোলন ।। রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে সমন্বয়ের অভিযোগ

১

রায়পুর বাজারে যানজট নিরসনে হকার উচ্ছেদে পৌরসভার উদ্যোগ

২

রায়পুরে স্বর্ণের দোকানে ভাঙচুরের অভিযোগ, তিন নারী থানায়

৩

তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে লক্ষীপুরে প্রতিপক্ষের হামলায় ব্যবসায়ী নিহত, ছেলে গুরুতর আহত

৪

রামগঞ্জে বাসচাপায় আলিম উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী নিহত, সড়ক অবরোধ, যান চলাচল বন্ধ,মানববন্ধন

৫

রামগঞ্জের কাঞ্চনপুর দরগাহ শরিফে ২৬ নভেম্বর ১১ই অগ্রহায়ণ ৬৬৭তম বার্ষিক ওরশ মোবারক

৬

এইচএসসি ফলাফলে লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রথম রায়পুরের কাজী ফারুকী কলেজ

৭

শ্রী শ্রী রক্ষাকালী মন্দির কমপ্লেক্সের কার্যনির্বাহী কমিটির পরিচিতি সভা, অভিষেক ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত

৮

রামগঞ্জ মডেল কলেজে সর্বোচ্চ নম্বর ১১৫৯ নম্বর পেয়ে জিপিএ-৫ পেলেন জান্নাতুল ফেরদাউস

৯

নেপথ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী লক্ষ্মীপুর-রামগতি সড়কের দেড়শ কোটি টাকার কাজ যুবলীগ নেতার কব্জায়

১০

অভিমানী

১১

এইচএসসিতে অ-কৃতকার্য, অ-ভিমানে কিশোরীর আ-ত্ম-হ-ত্যা

১২

রামগঞ্জে আন্তর্জাতিক বলদেব সংঘের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

১৩

রায়পুরে সুপারি বাগান থেকে বৃদ্ধের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

১৪

রায়পুরে বিশ্বধর্ম মঞ্জিলে চুরির অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতায় মহাপরিচালক

১৫

লক্ষ্মীপুরে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হয়রানিমুলক মামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন, বিক্ষোভ

১৬

রামগঞ্জে পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন মামলায় ৫ জন গ্রেপ্তার

১৭

পুলিশের দুর্নীতি বন্ধ হয়নি: এমপি খায়ের ভূঁইয়া

১৮

রায়পুরে ঘরে-ঘরে লক্ষ্মীপূজা উদযাপিত

১৯

কমলনগরে ডিবির অভিযানে ১১০ পিস ইয়াবাসহ একজন আটক, অটোরিকশা জব্দ

২০