বিশেষ প্রতিনিধি :
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের অসহায়ত্ব তুলে ধরে বিভিন্ন চ্যারিটি-সংস্থা থেকে অর্থ হাতিয়ে ‘কোটিপতি’ বনে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে জাহাঙ্গীর আলমের ‘কথিত ব্যবসায়ীর’ বিরুদ্ধে। কাতার চ্যারিটির দেওয়া স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এখন তার বাড়ি। অভিযোগ রয়েছে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার কথা বলে জাহাঙ্গীর ‘মাস্তুল ফাউন্ডেশনের’ নামে হতদরিদ্র মানুষের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর উপজেলার চরমার্টিন ইউনিয়নের মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মো. খবিরের ছেলে। তিনি নিজেকে ব্যবসায়ী দাবি করলেও কি ব্যবসা করেন তা জানাতে পারেননি। তবে তিনি জানিয়েছেন বিভিন্ন সংস্থা থেকে অর্থায়ন নিয়ে গ্রামগঞ্জে মসজিদ-মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ করেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৩ সালে ক্যাতার চ্যারিটি থেকে হতদরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে চরমার্টিন ইউনিয়নের মুন্সিগঞ্জ এলাকায় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর কাতার চ্যারিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য একটি কক্ষের অংশীদারিত্ব পেতে কাতার চ্যারিটি জাহাঙ্গীরকে ১১ লাখ টাকা দেয়। ঘটনাস্থলে ২ তলা ভবন রয়েছে। সেখানে একটি মাদ্রাসাও রয়েছে। তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একটি নামফলক ভবনের সামনে বারান্দার পাশে দেখা গেলেও কোন কার্যক্রম নেই। কাতার চ্যারিটির উদ্দেশ্য ছিল, দুর্গম এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া। কিন্তু এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে কোনোদিন চিকিৎসাসেবা পাননি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়িটির একটি অংশ মাদ্রাসা হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আরেকটি অংশে বসবাস করছেন জাহাঙ্গীর নিজেই। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার মতো কাতার চ্যারিটির নামফলকটিও এখন ধূসর।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল বাতেন বাবুল বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র হবে, এলাকার মানুষ চিকিৎসাসেবা পাবে এমন কথা আমরা শুনেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে কোনোদিন চিকিৎসক বসতে বা রোগী দেখতে দেখিনি। এলাকার দরিদ্র মানুষকে চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হয়। অথচ এখানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নামে টাকা নেওয়া হলেও আমরা কোনো সেবা পাইনি। তিনজন চিকিৎসকের জন্য প্রতিমাসে বেতনের টাকা আসে। চিকিৎসকরা তার পরিবারের লোক। একজন হাতুড়ি ডাক্তার মুন্সিগঞ্জ বাজার আব্দুর রহিম, জাহাঙ্গীরের ভাই সোহেল ও আরেকজন তার ভাবি। ওষুধগুলো আবদুর রহিম বাহিরে বিক্রি করে দেন।

নুর মোহাম্মদ ও শফিকুর রহমানসহ স্থানীয় ৫ জন বাসিন্দা জানায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নামে বরাদ্দ ও সুযোগ-সুবিধা থাকলেও সাধারণ মানুষ তার কোনো সুফল পাননি। মাস্তুল ফাউন্ডেশনের নাম ভাঙিয়ে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার আশ্বাসে অসহায়-দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা করে জাহাঙ্গীর হাতিয়ে নিয়েছে। গত এক বছরে ১ থেকে দেড় কোটি টাকা এভাবে নিয়ে গেছেন তিনি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রশাসনের তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ অস্বীকার করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কাতার চ্যারিটি ১১ লাখ টাকা দিয়ে আমার ভবনের একটি কক্ষের অংশীদারিত্ব নিয়েছে। এখনো সেটা তাদের জন্যই বরাদ্দ আছে। মাঝে মাঝে টিকা কার্যক্রম এখানে পরিচালনা করা হয়। আর কোন সংস্থার নাম দিয়ে কারো কাছ থেকে টাকা নেওয়া ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সত্য নয়। আমি প্রতিষ্ঠিত পরিবারের ছেলে, ব্যবসায় করি। মুন্সিগঞ্জ বাজারে আমার একটি মার্কেট রয়েছে। আমি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবো। এজন্য একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
মাস্তুল ফাউন্ডেশনের লক্ষ্মীপুরের প্রতিনিধি এডভোকেট রাকিব হোসেন তামিম বলেন, জাহাঙ্গীর নামে কাউকে আমরা চিনি না। আর লক্ষ্মীপুরে কাউকে ঘর দেওয়ার কোন উদ্যোগ নেই। কেউ যেন মাস্তুল ফাউন্ডেশনের নাম ভাঙিয়ে কারো কাছ থেকে টাকা নিতে না পারে সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়েছেন তিনি।
কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাহাত উজ জামান বলেন, মাস্তুল ফাউন্ডেশনের নামে টাকা উঠানোর বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে কাতার চ্যারিটির স্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিষয়টি একজন ইউপি সদস্যের কাছ থেকে জানতে পেরেছি। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন