banglarmukul
২৩ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১০ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

লক্ষ্মীপুরে অনিয়ম করা প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হলো ৯ কোটি টাকার কাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: লক্ষ্মীপুরে পূর্বে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পরেও আবারও সেই প্রতিষ্ঠানকে হতদরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে দেয়া প্রায় ৯ কোটি টাকা বরাদ্দে ২৫০০ টুইন পিট ল্যাট্টিনের কাজ দেয়া হয়েছে। অনিয়ম কারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান গ্রীণ ডট লিমিটেড। তদন্তে গিয়ে অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছে লক্ষ্মীপুর জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর-লক্ষ্মীপুর এর নির্বাহী প্রকৌশলী। এরপরও অদৃশ্য কারণে লাইসেন্সটি কালো তালিকাভুক্ত করা হয়নি। দেয়া হয়নি কোনো শাস্তি। উল্টো পূর্বের অনিয়মের সত্যতা থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে আরও ২৫০০ ল্যাট্টিনের কাজ দেওয়া হয়। এর সঙ্গে প্রকল্প পরিচালকের ‘অংশীদারিত্ব’ থাকায় একই প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজটিও গ্রীণ ডট লিমিডেট পেতে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সাধারন ঠিকাদারদের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর লক্ষ্মীপুর অফিস জানায়, লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় ২৫০০ টুইন-পিট ল্যাট্টিন স্থাপনে গত ১৩ জানুয়ারী ২০২৫ সালে লক্ষ্মীপুর পৌরসভা এলাকায় ২৫০০টি ১,০০০ লিটার ধারণক্ষমতার Containment System নির্মাণের জন্য দরপত্র দেওয়া হয়েছে। যার Package নং- LAK-S2 এবং Tender ID: 1045185। ইজিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তখন গ্রীণ ডট লিমিটেড নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পায়। পরবর্তিতে কাজটি বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক অনিয়ম করে।
জানা যায়, ডিজাইন বহির্ভূতভাবে কাজ করার পাশাপাশি আরও নানান অনিয়ম করা হয়েছে কাজটিতে। নির্মিত ল্যাট্টিনগুলোতে নিম্নমানের ইট-সুড়কি ব্যাবহার করা হয়েছে। মেহগনি কাঠের স্থলে কড়ই কাঠ দেয়া হয়েছে। কাঠের মাপও কম দেয়া হয়েছে। খুঁটি ৪ ইঞ্চির স্থলে ৩ ইঞ্চি, সিঁড়ির ধাপ ৩ টার স্থলে ২টা-১ টা এবং রিং কম দেয়া হয়েছে। সর্বোপরি ল্যাট্টিনগুলো গুনগত মান কম হয়েছে। এমতাবস্থায় গত ২০ এপ্রিল ২০২৬ ইং তারিখ কাজের অনিয়ম প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আক্তার স্বাক্ষরিত চিঠি দেয়া হয় ওই প্রতিষ্ঠানকে। একইসাথে কাজ সংশোধনের নির্দেশনাও দেয়া হয়। অভিযোগ আছে চিঠি দেয়ার পরও সম্পূর্ণ কাজগুলো সংশোধন না করেই প্রতিষ্ঠানটি অফিস কর্তাদের ম্যানেজ করে বিল উত্তোলন করে নেয়।
এ প্রসঙ্গে আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রহমান এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি আনিসুর রহমান রনি বলেন, গ্রীন ডট লিমিটেড কাজে ব্যাপক অনিয়ম করেছে। এটি প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন বা নকশা অনুযায়ী কাজ না করে নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করলে লাইসেন্স কালতালিকাভুক্ত করার নিয়ম রয়েছে। অথচ গ্রীনডটের ক্ষেত্রে এমন অনিয়ম প্রমানিত হলেও প্রতিষ্ঠানটিকে অদৃশ্যকারনে কাল তালিকাভুক্ত করা হয়নি। উল্টো এখন আবার সেই প্রতিষ্ঠানকেই ২৫০০ ল্যাট্টিনের আরও কাজ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বিগত ১৮ ফেব্রুয়ারি একই প্রকল্পের ২য় ধাপের কাজের দরপত্র আহবান করা হয়। যার প্যাকেজ নং- Lak-S3, টেন্ডার নং-১১৫০৭৮৫। বাংলাদেশের ১০টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শহরে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমন্বিত স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধির প্রকল্পের মাধ্যমে পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে এ ল্যাট্টিনগুলো স্থাপন করা হবে। গত ১৮ মার্চ দরপত্র খোলা হয়। ১০ টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করে। এতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে যৌথভাবে কাজটি পায় মেসার্স লাকি-এস জেসি (জেবি)। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিকে ডাকা হলেও কর্তৃপক্ষ না আসায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা গ্রীণ ডট লিমিটেডকে কাজটি দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান মেসার্স লাকি-এসজেসি ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা গ্রীণ ডট লিমিটেড যোগসাজসে দরপত্র জমা দেয়। এতে কারসাজি করে লাকি-এসজেসি কাজ বুঝে নেয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ বুঝে নেওয়ার জন্য আহবান করলেও প্রতিষ্ঠানের স্বত্ত্বাধিকারী সাড়া দেননি। এতে পূর্বে অনিয়মে অভিযুক্ত থাকলেও সিস্টেম অনুযায়ী দ্বিতীয় দরদাতা জাহেদুল ইসলামকে কাজটি দেওয়া হয়। মূলত প্রকল্প পরিচালক তার পছন্দ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয় এবং প্রকল্প পরিচালকই সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন। প্রায় ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রতিটি ল্যাট্টিন থেকে ৫ পার্সেন্ট কমিশন নেয় প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী। নাম না প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক তিনজন ঠিকাদার বলেন, গ্রীণ ডট লিমিটেড তাদের পূর্বের ল্যাট্টিন স্থাপনের কাজে নির্ধারিত ডিজাইন অনুসরন না করাসহ নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করেন। এ ঘটনায় নির্বাহী প্রকৌশলী তদন্তে গিয়ে সত্যতা পেয়েছেন।
এতে গত ২০ এপ্রিল জনস্বাস্থ্যের নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিছ আকতার এ বিষয়ে চিঠি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় সঠিক নিয়মে কাজ করার জন্য নির্দেশনা দেয়। কিন্তু কয়েকটি কাজ করলেও পুরোপুরি নির্দেশনা মানা হয়নি। পূর্বে যে প্রতিষ্ঠান অনিয়মে ধরা পড়ে, সে একই প্রতিষ্ঠান কিভাবে আবারও কাজ পায়। মূলত লক্ষ্মীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিছ আক্তার ও প্রকল্প পরিচালক দুর্নীতিগ্রস্ত। তারা প্রতিটি ল্যাট্টিন থেকে ৫ পার্সেন্ট কমিশন নেয়। এতে প্রকল্পটি থেকে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা তাদের পকেটেই যায়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রীণ কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধি রুবেল হোসেন বলেন, গ্রীণ ডট লিমিটেডের সঙ্গে প্রকল্প পরিচালকের অংশীদারিত্ব রয়েছে। এছাড়া সর্বনিম্ন দরদাতা ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার যোগসাজস রয়েছে। কারসাজি করেই গ্রীণ ডট লিমিটেডকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স লাকি-এসজেসি’র (জেবি) প্রতিনিধি নাছির উদ্দিন বলেন, কাজের জন্য আমরা যে দর উপস্থাপন করেছি, তা বর্তমান বাজার দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য ছিল না। কাজটি করলে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হতাম। এজন্য আমরা কাজটি নিইনি।
তবে গ্রীণ ডট লিমিটেডের প্রতিনিধি খলিলুর রহমান আজাদ বলেন, পূর্বের কাজে জায়গা সংকুলান থাকায় ডিজাইন নিয়ে কিছুটা অনিয়ম হয়। পরে তা আবার ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে আমাদের কোন যোগসাজস নেই। ‘ফ্যাসিস্ট আমলের’ নিয়ম এখনো চলমান রয়েছে, সেই নিয়ম অনুযায়ী এখন আমরা কাজ পাচ্ছি।

গ্রীণ ডট লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবিএম জাহিদুল ইসলাম বলেন, পূর্বের কাজগুলো সঠিকভাবেই করেছি। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে কাজের মান সঠিক ছিল উল্লেখ করে ছাড়পত্রও দিয়েছে। এছাড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল থেকেও অনিয়ম সংক্রান্ত কোন চিঠি আমি পাইনি। প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোন সম্পর্ক বা লেনদেন নেই।

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জুলফিকার হোসেন বলেন,যেহেতু পৌর এলাকায় ল্যাট্টিনগুলো স্থাপন করা হয়েছে সেহেতু আমরা একটা ছাড়পত্র দিয়েছি,তবে সেটা মানের উপর নয়-সংখ্যার উপর ভিত্তি করে।
লক্ষ্মীপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী বিলকিস আকতার বলেন, সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাগজপত্র যাচাইবাছাইয়ের জন্য আহবান করা হয়েছে। কিন্তু তারা আসেনি। এজন্য দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে ডাকা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এখন তাদেরকে কাজ দেওয়া হবে। তবে দ্বিতীয় স্থানে থাকা দরদাতা প্রতিষ্ঠান গ্রীণ ডট লিমিটেড পূর্বে ল্যাট্টিন নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম করেছেন। তখন চিঠি দেওয়া হয়েছিল, সবগুলো কাজ পুনরায় করার জন্য বলা হয়। কিন্তু তারা নির্দেশনা মানেনি। এরপরও প্রতিষ্ঠানটিকে কেন তালিকাভুক্ত করা হয়নি, এই প্রশ্নে কোন জবাব দেননি তিনি।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক এস এম শামীম আহমেদের মোবাইলফোন কল দিলে তিনি সকল অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানান, নির্বাহী প্রকৌশলী ক্লিয়ারেন্স দিলেই ঠিকাদার বিল পায় আবার কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সেই একই নিয়ম।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

লক্ষ্মীপুরে অনিয়ম করা প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হলো ৯ কোটি টাকার কাজ

রায়পুরে চাঁপরাশি বাড়ি ঐক্য ফোরামের ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প ‎

লক্ষ্মীপুর বালিকা বিদ্যানিকেতনের কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা প্রদান

রামগঞ্জে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও অভিভাবক সমাবেশ

বন্ধুত্ব নষ্ট করতে চাই না, দেখবো দেশের স্বার্থ: পানি সম্পদমন্ত্রী

লক্ষ্মীপুর এলজিইডি অফিসে লুটপাটের উৎসব দুদকের অনুসন্ধান চায় স্থানীয়রা

রামগতিতে ভূমি সচেতনতা মূলক সভা অনুষ্ঠিত

রায়পুরে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে র‌্যালি, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ

লক্ষ্মীপুরে জমি নিয়ে বিরোধ, শালিসির রায় না মেনে সীমানা নির্মাণে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা

রায়পুরে জমি নিয়ে বিরোধ, ঘর নির্মাণ ও বেড়া ভাঙাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা

১০

রায়পুরে ভক্তিবেদান্ত মেগা কনটেস্ট অনুষ্ঠিত

১১

রায়পুরে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেল সৌরভ সাহা

১২

রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে নবাগত সিভিল সার্জন

১৩

রায়পুরে ২০৪ পিস ইয়াবাসহ নারী আটক

১৪

রায়পুরে পূজা উদযাপন পরিষদের নবনির্বাচিত নেতৃবৃন্দকে সংবর্ধনা

১৫

কমলনগরে জমিজম  সংক্রান্ত বিরোধের জেরে   পুত্রবধূদের হামলায় বৃদ্ধা শাশুড়ি-ননদ আহত

১৬

বিচিত্র পেশা কুঁচিয়া ধরা কুঁচিয়া শিকার করেই যাদের জীবিকা নির্বাহ

১৭

লক্ষ্মীপুরে ৭ বছরের দুই শিশুকে যৌন নিপিড়নের মামলায় বৃদ্ধ গ্রেপ্তার

১৮

রামগঞ্জে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

১৯

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রামগঞ্জে বিএনপির আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

২০