কাজী মুহাম্মদ ইউনুছ,
কমলনগর(লক্ষ্মীপুর) থেকে :
মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হারিয়ে একসময় নিঃস্ব হয়েছিলেন হাজারো মানুষ। বছরের পর বছর ধরে যেসব নিমজ্জিত এলাকার ওপর দিয়ে চলেছে নৌযান, সেখানেই এখন জেগে উঠছে বিস্তীর্ণ চর। হারিয়ে যাওয়া জমিতে সবুজ ঘাস দেখে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন বুনছেন নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা। তবে চাষাবাদের প্রস্তুতির মধ্যেই জেগে ওঠা এই ভূখণ্ড নিয়ে প্রভাবশালী দখলদার চক্রের তৎপরতায় শুরু হয়েছে সংশয় ও আতঙ্ক।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ‘কটোরিয়া ও কাঁকড়ার চর’-এর প্রায় ৬০০ একর জমি এককভাবে দখলে নেয় স্থানীয় একটি ‘মাতব্বর’ চক্র। চার বছর ধরে ভোগদখলের পর সম্প্রতি চরটি ভোলার চরফ্যাশনের বাসিন্দা সকেট জামালের কাছে এক বছরের জন্য ৩৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। এবার চক্রটির নজর পড়েছে দক্ষিণ জগবন্ধু সীমানায় নতুন জেগে ওঠা চরের ওপর। কোনো মালিকানা না থাকলেও কেবল গায়ের জোরে তারা এই নতুন চর দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সাল থেকে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনে উপজেলার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ধারাবাহিকভাবে ২০১৩-১৪ সালের দিকে চর কালকিনি ও সাহেবেরহাট ইউনিয়ন দুটি প্রায় পুরোপুরি মানচিত্র থেকে মুছে যায়। এছাড়া চর ফলকন, পাটওয়ারীরহাট ও চর লরেন্স ইউনিয়নের একটি বড় অংশ নদীতে তলিয়ে যায়। এতে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হাজার হাজার পরিবার উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছিটকে পড়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
সম্প্রতি নদীরবুকে ফিরে আসছে সেই হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ড। কমলনগর উপজেলার দক্ষিণ জগবন্ধু সীমানায় একটি বড় অংশে চর জেগেছে। এর ৫ বছর আগে ‘কটোরিয়া ও কাঁকড়ার চর’ এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমি দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু নতুন চর জেগে ওঠার পর থেকেই শুরু হয়েছে দখলের মহোৎসব।
ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের অভিযোগ, কটোরিয়া ও কাঁকড়ার চরের প্রায় ৬০০ একর জমি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এককভাবে দখল করে নেন স্থানীয় প্রভাবশালী ‘মাতব্বর’ চক্রটি। বিগত চার বছর তা নিজেরা ভোগদখল করার পর, চলতি বছর চরটি ভোলা জেলার চরফ্যাশনের বাসিন্দা সকেট জামালের কাছে ৩৪ লাখ টাকায় ইজারা দিয়েছেন তারা।
এখন সেই মাতব্বর চক্রের নজর পড়েছে দক্ষিণ জগবন্ধু সীমানায় জেগে ওঠা নতুন ভূখণ্ডের ওপর। নিজেদের কোনো মালিকানা না থাকা সত্ত্বেও কেবল গায়ের জোরে চরটি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা।
এদিকে নিজেদের জমি ফিরে পেতে এবং জবরদখল রুখতে একত্রিত হয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তারা গঠন করেছেন ‘চর জগবন্ধু, ফলকন ও পাটারিরহাট ভূমিমালিক ঐক্য পরিষদ’।
দক্ষিণ জগবন্ধু ভূমিমালিক সমিতির সভাপতি জহির উদ্দিন রিয়াজ জানান, “সাহেবেরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ জগবন্ধুর নিজস্ব সীমানায় নতুন এই চর জেগে উঠেছে। এতে মাতব্বরদের কোনো জমি নেই। প্রকৃত ভূমিমালিকেরা যেন এখানে শান্তিপূর্ণভাবে চাষাবাদ করতে পারেন, আমরা সেই চেষ্টাই করছি।”
পাটওয়ারীরহাট ইউনিয়নের ভূমিমালিক সমিতির নেতা জাহাঙ্গীর মেম্বার বলেন, “ভাঙনের শিকার জগবন্ধু, ফলকন ও পাটওয়ারীরহাটের ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছি। কিন্তু মাতব্বর গোষ্ঠী ও ফলকনের একটি প্রভাবশালী গ্রুপ ভিন্ন উদ্দেশ্যে জমিগুলো জোরপূর্বক একা ভোগদখলের পাঁয়তারা করছে।”
সাহেবেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর মো. মাসুদ অভিযোগ করে বলেন, “আওয়ামী লীগের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাতব্বররা একটি চর দখল করে সুবিধা নিয়েছে। এখন তারা প্রকৃত ভূমিমালিকদের বঞ্চিত করে দক্ষিণ জগবন্ধুর নতুন চরটিও দখলের চক্রান্ত করছে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাতাব্বর বংশের পক্ষে খোকন মাতব্বর বলেন, “এককভাবে যে চরটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটি আমাদের পূর্বপুরুষ ও আত্মীয়স্বজনদের চাষাবাদি জমি।”
”নতুন করে জেগে ওঠা চরটিতে আমাদের বসতবাড়ি ছিল; তাই ওই চরে আমাদের দাবি থাকাটা স্বাভাবিক।
৩৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তা অস্বীকার না করে খোকন মাতাব্বর বলেন, “সেখানে অন্য কারও জমি নেই। তাই সেখানে আমরা যা করি, তা আমাদের নিজস্ব বিষয়।”
এ বিষয়ে কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাহাত উজ জামান বলেন, “চর পুরোপুরি জেগে উঠলে জরিপ পরিচালনা করা হবে। এরপর বিধি অনুযায়ী তা বন্দোবস্ত দেওয়া হবে। এর আগে চরের ওপর কারও মালিকানা দাবি করার সুযোগ নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
মন্তব্য করুন