মাহমুদুর রহমান মনজু :
লক্ষ্মীপুরের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের মহৎ উদ্যোগ হিসেবে চালু হওয়া ‘স্বপ্নযাত্রা’ অ্যাম্বুলেন্স প্রকল্প আজ বাস্তবতায় ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিকল্পনার ঘাটতি, তদারকির অভাব ও দায়িত্বহীনতার কারণে কোটি টাকার এই জনসেবামূলক প্রকল্প এখন কার্যত অচল।

২০২২ সালের ৬ অক্টোবর তৎকালীন জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোছাইন আকন্দের উদ্যোগে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ কর্মসূচির আওতায় লক্ষ্মীপুরের পাঁচটি উপজেলায় ১৬টি স্থল অ্যাম্বুলেন্স ও একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালু করা হয়। বিশেষ করে রামগতি উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চর আব্দুল্লাহ, তেলিয়ার চর ও চরগজারিয়ার প্রায় ২০ হাজার মানুষের জন্য ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবা।
জাইকা, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা এই ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি উদ্বোধনের পর থেকেই চালক সংকট ও জ্বালানি সমস্যার কারণে একদিনের জন্যও চালু করা যায়নি। বর্তমানে এটি রামগতি পৌরসভার আলেকজান্ডার এলাকার একটি খালে বিকল অবস্থায় পড়ে আছে, যেন নিজেই অবহেলার এক নিঃশব্দ সাক্ষী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়নি। চালক নিয়োগ ও তাদের নিয়মিত বেতনের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় শুরু থেকেই সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ফলে অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্সই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
আরও জানা যায়, কিছু ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্সগুলো নীতিমালা উপেক্ষা করে দূরপাল্লার রোগী পরিবহন, রাজনৈতিক কার্যক্রম এমনকি সাধারণ যাত্রী বহনের কাজেও ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
চরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, অতিরিক্ত ভাড়া ও অনিয়মের কারণে তারা এ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে যাদের জন্য এই উদ্যোগ, তারাই এর সুফল পাননি।
চর আব্দুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মঞ্জু বলেন, “নদী বেষ্টিত এই অঞ্চলে ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্সটি মানুষের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু এটি চালু না হওয়ায় মানুষ কোনো উপকার পায়নি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান জানান, ভালো উদ্যোগ হলেও কার্যকর পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবে এটি এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চালকদের নির্দিষ্ট বেতন না থাকায় দীর্ঘমেয়াদে সেবা চালু রাখা সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটি স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া পরিচালিত হওয়ায় তারা এতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেননি।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। কেন এতদিন অ্যাম্বুলেন্সটি অচল রয়েছে, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে, বর্তমান জেলা প্রশাসকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সবশেষে বলা যায়, মানুষের জীবন রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ সঠিক পরিকল্পনা, জবাবদিহিতা ও তদারকির অভাবে আজ অচল হয়ে পড়েছে—যা সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ববোধ ও কার্যকারিতার প্রশ্ন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
মন্তব্য করুন