মোঃ জহির হোসেন :
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠ এখন হলুদের মায়াবী আভায় ভরে উঠেছে। বাতাসে দুলছে সূর্যমুখী ফুল, আর তার সঙ্গে দুলছে কৃষকের স্বপ্ন। একসময় অনাবাদি পড়ে থাকা জমিতে এখন পরিকল্পিতভাবে সূর্যমুখী চাষ করে কৃষকরা এনেছেন দৃশ্যমান পরিবর্তন। অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষি বিভাগের পরামর্শে চলতি মৌসুমে এখানে বাম্পার ফলনের আশা দেখা দিয়েছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে ৫৫ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছিল, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ হেক্টরে। এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে প্রায় ৩৫ হেক্টর। ফলে ধান ও অন্যান্য রবি শস্যের পাশাপাশি সূর্যমুখী এখন লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে সূর্যমুখীর চাষ হলেও সবচেয়ে বেশি সফলতা মিলেছে ১ নম্বর উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নে। বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলজুড়ে এখন সূর্যমুখীর সমারোহ। উর্বর মাটি ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে এখানে ফলন হয়েছে চোখে পড়ার মতো।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিঘার পর বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর সমারোহ। মৌমাছির গুঞ্জন আর ফুলের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। তবে এতে কিছুটা সমস্যায় পড়ছেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষক নুরু বেপারী জানান, কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন তিনি। ফলন ভালো হলেও দর্শনার্থীদের ভিড়ে ফসল নষ্ট হচ্ছে এবং অনেকে ফুল ভেবে তা তুলে নিচ্ছেন, ফলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
অন্য কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতি বিঘায় ৬-৭ মণ বীজ পাওয়ার আশা করছেন। দাম ভালো পেলে আগামীতে আরও বেশি জমিতে চাষ করবেন। তবে বাজারজাতকরণে সমস্যার কথাও জানান অনেক কৃষক। পাইকাররা অনেক সময় কম দাম প্রস্তাব করায় লাভ কমে যায়।
রায়পুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম বলেন, রায়পুরের মাটি সূর্যমুখী চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের বীজ সরবরাহ থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহ ও তেল আহরণ পর্যন্ত সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে রায়পুরকে সূর্যমুখী উৎপাদনের একটি ‘হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সূর্যমুখী চাষ ভোজ্য তেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে সহায়ক এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আধুনিক মাড়াই যন্ত্রের অভাব এবং বাজারজাতকরণের সীমাবদ্ধতা কৃষকদের জন্য বড় বাধা। কৃষকদের দাবি, সহজ শর্তে ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা পেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, রায়পুরের চরাঞ্চলে সূর্যমুখীর এই সমারোহ কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সমন্বিত উদ্যোগে রায়পুর অচিরেই দেশের অন্যতম সূর্যমুখী উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হবে।
মন্তব্য করুন