banglarmukul
৩ এপ্রিল ২০২৬, ৬:৫৫ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

যান্ত্রিক যুগে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার করাতি পেশা

মাহমুদুর রহমান মনজু :

একসময় গ্রামবাংলার অতি পরিচিত দৃশ্য ছিল করাতিদের গাছ কাটার কাজ। করাত টানার ছন্দ, গানের সুর আর কর্মব্যস্ততার সেই মুহূর্ত এখন আর চোখে পড়ে না। কালের বিবর্তন ও জীবিকার তাগিদে পেশা পরিবর্তনের ফলে ঐতিহ্যবাহী করাতি সম্প্রদায় আজ বিলুপ্তির পথে।


লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন গ্রামে একসময় করাতি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। শুষ্ক মৌসুম এলেই তারা দল বেঁধে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বড় বড় গাছ কেটে কাঠ তৈরি করতেন। গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে গাছ কাটার কাজ নেওয়াই ছিল তাদের প্রধান জীবিকা। কাঁধে করাত, হাতে কুড়াল, দা ও মোটা দড়ি নিয়ে তারা হাকডাক দিয়ে বলতেন—“গাছ চিরাবেন গাছ!” তখন গৃহস্থরা গাছ কাটার জন্য তাদের অপেক্ষায় থাকতেন।


আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে এখন যান্ত্রিক ‘স’ মিল গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। ফলে করাতি পেশার চাহিদা কমে গেছে। বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অনেকেই এখন অন্য লাভজনক পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তবে দেশের কিছু এলাকায় এখনো জীবিকার তাগিদে এই পেশা ধরে রেখেছেন কয়েকজন।
নব্বই দশকের আগেও করাতিদের কাজ দেখতে পাড়ার মানুষ ভিড় জমাত। গানের তালে তালে করাত টানার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। করাতিরা সাধারণত সকালে গুড়-পান্তা বা লাল আটার রুটি খেয়ে কাজে নেমে পড়তেন। একটি দলে তিনজন গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত থাকতেন, আর একজন রান্নার দায়িত্ব পালন করতেন। এভাবেই পুরো মৌসুম কাজ করতেন তারা।


তৎকালীন সময়ে করাতিরা মাটিতে গর্ত করে বা কাঠের কাঠামো তৈরি করে করাত চালাতেন। এই পদ্ধতিতে গাছ কাটতে উপরে ও নিচে দুই থেকে ছয়জন লোকের প্রয়োজন হতো। বড় করাত দিয়ে গাছ চিরে বিভিন্ন সাইজের কাঠ তৈরি করা হতো, যা দিয়ে ঘরের খুঁটি, তক্তা, আদল ও রুয়া বানানো হতো। কাঠের আকার ও পরিমাণ অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হতো।
সরেজমিনে সদর উপজেলার পার্বতীনগর ইউনিয়ন ও রশিদপুর গ্রামের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৩৫ থেকে ৪০ বছর আগে ঘর নির্মাণের জন্য বড় গাছ কেটে করাতিদের দিয়ে কাঠ প্রস্তুত করা হতো। তখন বিভিন্ন গ্রামে একাধিক করাতি দল কাজ করত এবং তারা এলাকায় বেশ পরিচিত ছিলেন।
পার্বতীনগর ইউনিয়নের সৈয়দ আহমেদসহ অন্যান্য এলাকার করাতিরা দলবদ্ধভাবে গ্রামে গ্রামে কাজের সন্ধানে যেতেন। অনেক গৃহস্থ তাদের বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাঠের মাপ নির্ধারণ করে কাজ দিতেন।
বশিকপুর ইউনিয়নের পাটোয়ারী বাজারের নুর আলম জানান, তিনি দীর্ঘদিন এ পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আগে কাজের অভাব ছিল না, কিন্তু এখন আধুনিক যন্ত্রের কারণে কাজ কমে গেছে।
উত্তর হামসাদী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক ভূঁইয়া বলেন, “আমার কৈশোরে ঘর নির্মাণের জন্য করাতিরা গাছ কেটে তক্তা ও খুঁটি তৈরি করত। গানের সুরে করাত চালানোর সেই দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না।”
রায়পুর উপজেলার সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম টিটু বলেন, “ছোটবেলায় গ্রামের পথে হাঁটতে গিয়ে গাছ চিরানোর দৃশ্য দেখে আনন্দ পেতাম। এখন সেই দৃশ্য একেবারেই হারিয়ে গেছে।”
রামগঞ্জ উপজেলার আরিফ হোসেন জানান, আগে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই করাতিরা কাজ করত। কিন্তু এখন মানুষ শহরমুখী হওয়ায় এবং পাকা বাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই পেশার চাহিদা কমে গেছে।
কমলনগর উপজেলার আব্দুর রহমান বলেন, “বর্তমানে মানুষ ‘স’ মিলে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাঠ তৈরি করে নেয়। তাই করাতিদের প্রয়োজন আগের মতো নেই।”
রামগতি উপজেলার মোখলেসুর রহমান বলেন, “যন্ত্রচালিত করাতের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে কাজ শেষ করা যায়। তাই ঐতিহ্যবাহী করাতি পেশা টিকে থাকতে পারছে না।”
সদর উপজেলার করাতি আব্বাস মিস্ত্রি জানান, “আগে বাপ-দাদার সঙ্গে এই কাজ করতাম। এখন করাতকল স্থাপনের কারণে সেই পেশা ছেড়ে দিয়েছি। বর্তমানে একটি করাত মিলে কাজ করছি।”
গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল করাতি পেশা। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে সেই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন আর শোনা যায় না করাতের ছন্দময় শব্দ—যান্ত্রিক শব্দই যেন জানিয়ে দিচ্ছে সময়ের পরিবর্তনের গল্প।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আওয়ামীলীগ নেতার বাড়িতে হামলা,পরিবার নিরাপত্তা সংকটে!

লক্ষ্মীপুরে মারামারির ঘটনায় মামলায় বিএনপি নেতা কারাগারে

সহজ কিস্তির ফাঁদে নিঃস্ব গ্রাহক, লক্ষ্মীপুরজুড়ে মোবাইল বিক্রির নামে প্রতারণার অভিযোগ

কমলনগরে চাঁদাবাজির অভিযোগে যুবদল নেতা আটক, এলাকায় চাঞ্চল্য

জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি রায়পুর থানার শাহীন মিয়া

রামগতিতে ‘গরিবের সারু প্রফেসর’-এর বাড়িতে হামলা, ক্ষোভে ফুঁসছে এলাকাবাসী, ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির দাবি

লক্ষ্মীপুরে তরুণ উদ্যোক্তার সাফল্যগাঁথা: লিটনের ডেইরি খামারে স্বপ্নের বাস্তবায়ন

রায়পুরে ভুল প্রশ্ন সেটে পরীক্ষা, ৭৬০ শিক্ষার্থীর ফল নিয়ে চিন্তায় অভিভাবক

রায়পুরে খুন ঢাকতে ‘বানর নাটক’, সমালোচনার ঝড়

কমলনগরে অবৈধ মজুদের অভিযোগে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ীর বাড়িতে আগুন,ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক

১০

রায়পুরে ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার: পুলিশের দাবি সন্ত্রাসবিরোধী মামলা, পরিবারের অভিযোগ ভিন্ন

১১

‘কই ওঠার বৃষ্টি’—প্রকৃতির সংকেত বুঝে ডাঙায় ছুটে চলে কই মাছ

১২

লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্বের সূচনা, আহ্বায়ক সৌরভ ও সদস্যসচিব অভি সিনিয়র যুগ্ন আহবায়ক আব্দুল্লাহ আল খালিদ

১৩

স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনে গতি: লক্ষ্মীপুরে ৯৫ জনকে বাজুস স্মার্টকার্ড ও সনদ প্রদান

১৪

চরশাহীতে যুবদল কমিটি ঘিরে সংঘাত—প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে ঘিরে ‘ফেক ভিডিও’ অভিযোগে উত্তপ্ত পরিস্থিতি

১৫

রায়পুরে বাগান থেকে কিশোরের লাশ উদ্ধার

১৬

লক্ষ্মীপুরে ভগ্নিপতিকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টা, শ্বশুর-শ্যালকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা 

১৭

রায়পুরে তিন সন্তানসহ স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে তালা, তিন দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে

১৮

রায়পুরে তিন মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার

১৯

লক্ষ্মীপুরে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে বোন-ভগ্নিপতিকে হত্যা চেষ্টা, এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম

২০