প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ২০, ২০২৬, ৫:৩৩ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ৭:০৯ এ.এম

কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি :
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে শাহনাজ(২০) নামে এক প্রসূতিকে আটকে রেখে অননুমোদিত চিকিৎসক দিয়ে অপচিকিৎসা দিয়ে নবজাতককে মেরে ফেলার অভিযোগ উঠেছে লাইফ লাইন (প্রাঃ) নামক একটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রসূতির অবস্থাও এখন আশঙ্কাজনক হওয়ায় বিচার চেয়ে জেলা সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে জেলা সিভিল সার্জন ডা. বাহারুল আলমের কাছে এই লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন নবজাতকের বাবা মো. আরিফ হোসেন। একই সাথে অভিযোগের অনুলিপি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এবং লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো হয়েছে।
ভুক্তভোগী আরিফ উপজেলার চর লরেন্স ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মো. আজাদের ছেলে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ অক্টোবর (মঙ্গলবার) রাতে প্রসব বেদনা উঠলে আরিফ হোসেন তার স্ত্রী শাহনাজ বেগমকে করইতলা বাজার এলাকার ‘লাইফ লাইন’ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক সহকারী সুমাইয়া ইসলাম সুমনা প্রসূতির আলট্রাসোনোগ্রাফি করে স্বাভাবিক প্রসবের (নরমাল ডেলিভারি) আশ্বাস দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করান।
ভর্তির পর ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও প্রসবের কোনো অগ্রগতি না দেখে স্বজনরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসক সুমনা তাদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন। দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ না বললে স্বজনরা বিপদ বুঝতে পেরে প্রসূতিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের (রিলিজ) আকুতি জানান।
কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র না দিয়ে উল্টো রোগীকে আটকে রেখে একের পর এক ইনজেকশন দিতে থাকে। একপর্যায়ে গর্ভেই নবজাতকের মৃত্যু হলে তড়িঘড়ি করে অবশ করা ছাড়াই অস্ত্রোপচার (ছোট সিজার) করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চিকিৎসা সেবায় যুক্ত সুমাইয়া ইসলাম সুমনা কোনো এমবিবিএস ডিগ্রীধারী চিকিৎসক নন, তিনি মূলত ডিএমএফ (মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট) সনদধারী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা তোয়াক্কা না করে এমবিবিএস ডাক্তার ছাড়াই চলছে হাসপাতালটির কার্যক্রম। প্রসূতির চিকিৎসা বা আলট্রাসনোগ্রাফি করার কোনো বৈধ অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও সুমাইয়া ইসলামকে দিয়ে এসব স্পর্শকাতর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর আগেও উক্ত হাসপাতালে একাধিক নবজাতকের মৃত্যু এবং প্রসূতিদের শারীরিক জটিলতা তৈরির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
নবজাতকের বাবা আরিফ হোসেন বলেন, আমরা বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও আমাদের রোগীকে জেলা বা ঢাকা নিতে দেওয়া হয়নি। উল্টো আমাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে এবং রোগীকে একের পর এক ইনজেকশন পুশ করেছে।
তিনি আরো বলেন,অবশ না করেই তড়িঘড়ি করে ছোট সিজার ও সেলাই করায় এখন আমার স্ত্রীর অবস্থাও আশঙ্কাজনক। সে এখন লক্ষ্মীপুরের একটি হাসপাতালে গাইনি বিশেষজ্ঞের অধীনে চিকিৎসাধীন রয়েছে। চিকিৎসক জানিয়েছেন, তাকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হয়নি এবং সেলাইও ঠিকমতো করা হয়নি। এসময় আরিফ অবিলম্বে লাইফ লাইন হাসপাতাল ও চিকিৎসক সুমাইয়া ইসলামের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যাবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অভিযোগ প্রসঙ্গে লাইফ লাইন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের বিষয়টি শুনেছি। তবে কিছু লোক আমাকে সাময়িক হয়রানি করার মিশন নিয়ে এসব করছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. বাহারুল আলম অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনাটি তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, সিভিল সার্জন স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কনসালটেন্ট ডা. মনোয়ার হোসেনকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।