সাইফুল ইসলাম স্বপন :
‘আমার টাকা নেওয়ার ভিডিও প্রচার করলে আমার জন্য ভালো হতো। তাহলে কর্তৃপক্ষ আমাকে সাসপেন্ড করবে, আমি একটু বিশ্রাম নিতে পারব।’—নিজের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে এমন মন্তব্য করেছেন লক্ষ্মীপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমীন।
ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার একটি ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রথমে সেটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন তিনি। পরে ভিডিওর আংশিক দৃশ্য দেখানো হলে তাঁর বক্তব্যের পরিবর্তন আসে। একপর্যায়ে ভিডিওটি প্রচার হলে তাঁর জন্য ‘ভালো হবে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে লক্ষ্মীপুরের কয়েকজন ঠিকাদার সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ঠিকাদারি কাজের বিল ছাড় করাতে তাঁদের কাছ থেকে কমিশন দাবি করা হয়। দাবিকৃত অর্থ না দিলে বিল আটকে রাখারও অভিযোগ রয়েছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে একটি ভিডিও ক্লিপ পাওয়া গেছে, যেখানে নুরুল আমীনকে এক ঠিকাদারের কাছ থেকে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা নিতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি টাকা নিলে আপনি কি মাইন্ড করবেন? আমি কিন্তু টাকা নিলে কাউকে ফেরত দিই না।’
নিরাপত্তার কারণে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই ঠিকাদার জানান, লক্ষ্মীপুর পৌরসভার প্রায় ১৫ লাখ টাকার একটি কাজের জন্য তাঁর কাছ থেকে প্রথমে ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়। কাজ শেষে বিল চূড়ান্ত করার সময় আরও সাড়ে চার লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে বিল আটকে রাখার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও তাঁর দাবি। পরে ধাপে ধাপে টাকা দেওয়ার একপর্যায়ে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার দৃশ্য ভিডিও করা হয়।
ভিডিওটি পিডিবির সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের ডরমেটরিতে ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঠিকাদারি কাজ ও বিলসংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে সেখানে ঠিকাদারদের ডেকে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে।
প্রাপ্ত ভিডিওর আরেক অংশে নুরুল আমীনকে ‘মহিউদ্দিন’ নামের এক ঠিকাদারের প্রসঙ্গ তুলতে শোনা যায়। সেখানে তিনি বলেন, ওই ঠিকাদারের প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মালামাল আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে এবং তাঁকে দুই কোটি টাকা দিলে তিনি বিল সই করে দেবেন।
ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘মহিউদ্দিন পাঁচ কোটি টাকার মাল আত্মসাৎ করছে—আমাকে দুই কোটি টাকা দিলে আমি বিল সই করে দেব।’
একই ভিডিওতে একটি প্রকল্পের অর্থ ও বিল নিয়ে নিজের প্রভাবের কথাও বলতে শোনা যায় তাঁকে। এমনকি তাঁর অনুমতি ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিল ছাড় করা সম্ভব নয়—এমন দাবিও করেন তিনি।
‘মহিউদ্দিন’ নামের ওই ঠিকাদারের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বিষয়ে নুরুল আমীনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, প্রায় তিন বছর আগে লক্ষ্মীপুর পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে কমিশন দাবি, বিল আটকে রাখা এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠছে।
ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালী প্রধান সড়কের ৩৩ কেভি লাইন সংস্কারের পর পুরোনো বৈদ্যুতিক মালামাল, পিলার, টাওয়ার ও তার বেহাত হয়েছে। এসব মালামাল বেহাতের সঙ্গে নুরুল আমীনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নিজের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ থাকার বিষয়েও কথা বলেন নুরুল আমীন। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে দুদক তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তিনি প্রশাসনের মাধ্যমে দায়িত্ব থেকে সরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে চান বলেও মন্তব্য করেন।
তবে অভিযোগ ও ভিডিওতে থাকা বক্তব্যের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্তের কথা বলেন।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিওতে প্রকৌশলীর সরাসরি টাকা গ্রহণের অভিযোগ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে এ ধরনের ভিডিও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাঁর মতে, অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তবে ভিডিওটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, অর্থ লেনদেনের উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের হিসাব-নিকাশ স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের করা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণেও দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তই চূড়ান্ত ভিত্তি হবে।