প্রদীপ কুমার রায়:
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মাত্র কয়েক শতাংশ জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের জেরে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও সমাজসেবী ব্যক্তিত্ব মোঃ নাছির উদ্দিন বেপারী এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। যিনি জীবনের বড় একটি সময় মানুষের সেবা, সালিশ-মীমাংসা ও এলাকার উন্নয়নে কাটিয়েছেন, সেই মানুষটিকেই এবার নিজের আত্মীয়স্বজনের হাতে রক্তাক্ত হতে হলো—এমন ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোক, ক্ষোভ ও হতবাক নীরবতা।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার চরআবাবিল ইউনিয়নের হায়দরগঞ্জ বাজারে তার নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ হামলার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, জমিজমা নিয়ে বিরোধ মেটাতে বসা সমঝোতা বৈঠক মুহূর্তেই রূপ নেয় রণক্ষেত্রে।
স্থানীয়রা জানান, মৃত আমিন উল্লাহ বেপারির প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ জমি নিয়ে কয়েক বছর ধরে সাবেক চেয়ারম্যান নাছির বেপারী ও তার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিরোধ চলছিল। পারিবারিক এই বিরোধ নিষ্পত্তির আশায় সম্প্রতি সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে আবেদনও করেন তিনি। সেই সূত্রে মঙ্গলবার উভয় পক্ষ আলোচনায় বসেন।
কিন্তু শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশায় বসা সেই বৈঠকেই অভিযোগ উঠেছে, চেয়ারম্যানের আপন ভাগিনা ও স্বজনেরা ক্ষিপ্ত হয়ে তার ওপর হামলা চালায়। প্লাস্টিকের চেয়ার, লাঠি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাতে তাকে গুরুতর জখম করা হয়। মাথা, মুখ ও পায়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হলে চিকিৎসকরা প্রায় ২০টি সেলাই দেন। তার শরীরের বিভিন্ন অংশ রক্তাক্ত হয়ে পড়ে।
বাবাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে ছেলে মোশারফ হোসেনকেও বেধড়ক মারধর করা হয়। হামলায় আরও কয়েকজন আহত হন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে রায়পুর সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে অবস্থার অবনতি হওয়ায় নাছির বেপারী ও তার ছেলেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনার সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, দোকান থেকে নগদ প্রায় তিন লাখ টাকা লুট করা হয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, নাছির বেপারী দীর্ঘদিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এলাকার রাস্তাঘাট, সামাজিক উন্নয়ন, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পারিবারিক বিরোধ মীমাংসাসহ নানা মানবিক কাজে তিনি পরিচিত মুখ ছিলেন। এমন একজন মানুষকে নিজের আত্মীয়দের হাতে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে যেতে হওয়ায় সাধারণ মানুষও ব্যথিত।
একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, চেয়ারম্যান সাহেব বহু মানুষের উপকার করেছেন। আজ তাকেই যদি নিজের আত্মীয়রা এভাবে মারে, তাহলে সমাজ কোথায় যাচ্ছে?
বর্তমানে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন নাছির বেপারীর অবস্থা নিয়ে পরিবার উদ্বেগে রয়েছে। স্বজনদের কান্নায় হাসপাতাল ও বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া জানান, এখনও লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়রা দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রশ্ন—যে মানুষ সারাজীবন সমাজের জন্য কাজ করেছেন, শেষ বয়সে কি তার প্রাপ্য ছিল এমন নির্মমতা?