প্রদীপ কুমার রায়:
রায়পুর উপজেলার উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতি, কাজ ফেলে রাখা এবং সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ ছিল। কোথাও কাজ অর্ধেক, কোথাও মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্প ঝুলে ছিল। এমন অবস্থায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাঠমুখী তদারকি বাড়িয়েছেন। এতে স্থবির কয়েকটি প্রকল্পে আবার গতি ফিরতে শুরু করেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
শনিবার (৪ এপ্রিল) রায়পুর উপজেলার ৩ নম্বর চর মোহনা ও ৪ নম্বর সোনাপুর ইউনিয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটার আওতায় চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করেন ইউএনও। এ সময় তিনি প্রকল্পের কাজের গুণগত মান, অগ্রগতি ও পরিমাপ সরাসরি যাচাই করেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, কোথাও কোথাও তিনি ফিতা দিয়ে মেপে দেখেন, প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না।
পরিদর্শনকালে তার সঙ্গে ছিলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল হাই খান, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সাত্তার, ইউপি সদস্য ও গ্রাম পুলিশ সদস্যরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ইউএনও দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মেয়াদোত্তীর্ণ, স্থগিত ও আংশিক বাস্তবায়িত প্রকল্পের তালিকা আলাদাভাবে খতিয়ে দেখছেন। শুধু ফাইল দেখে সন্তুষ্ট না থেকে তিনি অনেক সময় সরাসরি ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে কাজের অগ্রগতি জানতে চান।
একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক দিন বন্ধ থাকা প্রকল্প নিয়েও তিনি নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন। কাজ বন্ধ কেন, মালামাল গেছে কি না, মাঠে কাজ হচ্ছে কি না—এসব জানতে চাইতেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো প্রকল্পে মালামালের দাম বেড়ে গেছে অজুহাতে কাজ বন্ধ থাকলে ইউএনও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে মাঠে পাঠিয়ে বাস্তবতা যাচাই করান। প্রয়োজনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলে নিশ্চিত হন—কাজ বাস্তবে হচ্ছে, নাকি শুধু কাগজে দেখানো হচ্ছে।
স্থানীয় সংবাদকর্মী জহির হোসেন বলেন, রায়পুর পৌরসভা এলাকা থেকে নর্দমা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কার কাজটি দীর্ঘদিন স্থবির ছিল। সম্প্রতি সেই কাজ আবার শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এ ক্ষেত্রে ইউএনওর ধারাবাহিক চাপ ও তদারকি বড় ভূমিকা রেখেছে।
স্থানীয় প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একাধিক প্রকল্পে তিনি সংশ্লিষ্টদের স্পষ্ট করে জানিয়েছেন—সময়সীমা, বরাদ্দ ও জনস্বার্থ উপেক্ষা করে কাজ ফেলে রাখার সুযোগ নেই। কয়েকজন ঠিকাদারকে তিনি আইনগত দায়বদ্ধতা, লাইসেন্স জটিলতা এবং প্রশাসনিক প্রতিবেদনের সম্ভাব্য প্রভাবের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এর পর অনেকেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সক্রিয় হয়েছেন।
রায়পুরে সাম্প্রতিক সময়ে ইউএনওর ভূমিকা শুধু উন্নয়ন প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ নেই। জাতীয় নির্বাচন ঘিরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নজরদারি এবং সংবেদনশীল বিষয়ে দ্রুত প্রশাসনিক সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রেও তার সক্রিয়তা স্থানীয়ভাবে আলোচিত।
উপজেলার বিভিন্ন সেক্টরে অনিয়ম ও শৈথিল্যের বিরুদ্ধে তিনি তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে অভিযোগ যেমন আছে, তেমনি সাধারণ মানুষের একাংশ এটিকে জবাবদিহিমূলক প্রশাসন হিসেবেও দেখছেন।
সচেতন মহল বলছে, একজন কর্মকর্তার মাঠে নামা ইতিবাচক বার্তা দিলেও এই উদ্যোগকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন—
সব প্রকল্পের অগ্রগতি তালিকা প্রকাশ, কাজের ছবি ও পরিমাপভিত্তিক নথি সংরক্ষণ,
স্থানীয়দের অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা জোরদার, এবং দীর্ঘমেয়াদি মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা। তাদের মতে, ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি এটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নিতে পারলেই উন্নয়ন আরও কার্যকর হবে।
মন্তব্য করুন