প্রদীপ কুমার রায় :
রায়পুর উপজেলার জনকল্যাণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির একটি শ্রেণিকক্ষে পলেস্তারা ধসে পড়ে পাঁচ শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের শিক্ষা অবকাঠামোর করুণ বাস্তবতা ও দায়িত্বহীনতার এক নির্মম চিত্র।
ঘটনার ভিডিওতে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত মুখ, আহত শিশুদের আর্তচিৎকার আর শ্রেণিকক্ষজুড়ে হুড়োহুড়ির দৃশ্য দেখে যে কোনো মানুষই শিউরে উঠবেন। একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এবং বিশেষ করে এই বিদ্যালয়ে ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কর্মরত হিসেবে ঘটনাটি আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
একটি শিক্ষালয় হওয়া উচিত নিরাপত্তা, জ্ঞান ও মানবিকতার আশ্রয়স্থল। যেখানে শিশুরা নিশ্চিন্তে বসে পাঠ নেবে, স্বপ্ন দেখবে, নিজেদের গড়ে তুলবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো শ্রেণিকক্ষের ছাদই নিরাপদ নয়। বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়া কোমলমতি শিশুরা যদি জীবনঝুঁকিতে থাকে, তাহলে আমরা কেমন ভবিষ্যৎ গড়ছি?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জানা গেছে প্রায় এক বছর আগে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভবনের করুণ অবস্থার কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ বিপদের আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তার পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এটি নিছক অবহেলা নয়, এটি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা। একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলতে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে নানা পরিকল্পনা, নতুন কারিকুলাম, আধুনিকায়ন, ডিজিটাল শিক্ষা—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষার প্রথম শর্তই যদি নিরাপদ পরিবেশ না হয়, তাহলে এসব উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত? সনাতনী শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয়ের আন্তরিক সম্পর্ক। আজ সেই সম্পর্কের জায়গায় যদি অনিরাপত্তা ঢুকে পড়ে, তবে তা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত।
একটি আহত শিশু মানে শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়; সে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সমাজের সম্ভাবনা, একটি দেশের ভবিষ্যৎ। শ্রেণিকক্ষে পলেস্তারা ধস মানে শুধু দেয়ালের ক্ষয় নয়, আমাদের বিবেকেরও ক্ষয়।
এই ঘটনার পর দায়সারা তদন্তে থেমে গেলে চলবে না। জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যালয়টির ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং রায়পুরসহ আশপাশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন পরিদর্শন এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও সংশ্লিষ্ট সব মহলকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
আজকের এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—শিক্ষা শুধু বই বা কারিকুলামের বিষয় নয়, এটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করারও বিষয়। আমরা চাই না, আর কোনো শিশুর আর্তচিৎকারে শ্রেণিকক্ষ কেঁপে উঠুক। আমরা চাই, শিক্ষালয় হোক সত্যিকারের নিরাপদ আশ্রয়।